ক্ষুধা আছে বলেই এমন তামাশা সয়ে যায় নিরবে

গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আমরা দিনভর একটি দৃশ্য দেখলাম, দলে দলে মানুষ ঢাকায় আসছে। পায়ে হেঁটে আসছে, কেউ ছোট ছোট বাহনে উঠছে কিছু সময়ের জন্য। আবার নেমে যেতে হচ্ছে। আবার হাঁটছে। যে যেভাবে পারছে ঢাকার দিকে রওনা দিয়েছে।

মহাসড়ের পাশ ধরে হেঁটে আসছে মানুষ। হাতে ছোট ছোট ব্যাগ। এরা কারা? কেন আসছে ঢাকায়? এ যেন যুদ্ধপীড়িত কোন অঞ্চলের ছবি। যেখানে এক এলাকা থেকে বাঁচার আশায় অন্য এলাকায় ছুটে যাচ্ছে মানুষ।হ্যাঁ, বাঁচার জন্যই ছুটে যাওয়া এবং আসা। এই শহরে দমবন্ধ শহরে নিম্ন আয়ের মানুষের জীবন যাপনের দৃশ্য যে কতটা অমানবিক অস্বাস্থ্যকর তা কেবল তারাই জানে। শুধু মাত্র বছর শেষে পরিসংখ্যান পড়ে সেসব বোঝার উপায় নেই। তাইতো শ্রমজীবীদের প্রায় সিংহাভাগ মানুষই করোনাভাইরাসের প্রকোপে সাধারণ ছুটিতে ছুটে গেছেন গ্রামে। ছুটে যেতে হয়েছে…। সেই সাধারণ ছুটি বর্ধিত হলো ১১ এপ্রিল পর্যন্ত, কিন্তু সেই ছুটির ভেতরই দলে দলে মানুষ ছুটে আসতে শুরু করেছেন ঢাকার দিকে।

কেন আসতে হচ্ছে এভাবে সেই ‘স্টে হোম সেইফ হোম’ থিওরি ভেঙে ফেলে? তাদের আসতে হচ্ছে কারণ তারা শ্রমিক। তাদের আসতে হচ্ছে কারণ কারখানা খুলে গেছে। এদের অনেকেই ছুটে আসছেন বকেয়া বেতনটি পাওয়ার আশায়। তারা ছুটে আসছেন চাকরিটি বেঁচে আছে কিনা, না কি চলে গেছে সেই খোঁজ নিতে। তারা আসছেন ছাঁটাই তালিকায় যেন নাম না ওঠে সেই কারণে। তারা আসছেন কারখানা খুলেছে এখন কলের চাকা না ঘোরালে এই শ্রমিকের রক্ষা নেই। চাকরি থাকবে না।

সরকার সাধারণ ছুটি ৪ এপ্রিল থেকে বাড়িয়ে ৯ এপ্রিল পর্যন্ত করেছে, সাথে সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে সেটা ১১ এপ্রিল পর্যন্ত পৌঁছেছে। সাথে সব ধরনের গণপরিবহণ বন্ধ থাকবে ১১ তারিখ পর্যন্ত। কিন্তু কারখানা খোলার ঘোষণা এসেছে! এখন এই শ্রমিকরা কিভাবে কারখানায় পৌঁছাবে এ নিয়ে কোনো ব্যবস্থা নেই। ভাবনা নেই। কেউ সে ব্যবস্থা করেনি, করার প্রয়োজনও মনে করেনি। না সরকার, না কারখানার মালিকরা।

মালিকরা কারখানা খোলার নির্দেশ দিয়ে বসে আছে, এবার শ্রমিকদের পালা যেভাবে হোক ফিরে আসতে হবে। এই ঝুকিপূর্ণ অবস্থাতেও কেন কারখানা খোলা হলো- সেই প্রশ্ন রাখার আগেই আমরা দেখলাম তাদের এই ঘোষণা পঙ্গপালের মতো পথে নামিয়ে এনেছে শ্রমিকদের। পোশাক শ্রমিক খাতে ৪৫ লাখ শ্রমিক কাজ করেন। এই শ্রমিকদের প্রায় সবাইকেই কর্মের তাগিদে ফিরতে হচ্ছে কর্মস্থলে।ঢাকামুখী শ্রমিকদের ফেসবুকে কয়েকটি ছবি দেখা গেলো। একটি ছবিতে দেখা গেলো প্রচুর মানুষ ফেরিতে করে নদী পার হচ্ছে। এই দৃশ্য কত ভয়ঙ্কর এই সময়ের জন্য! এই যখন পরিস্থিতি তখন শোনা গেলো অনেক শ্রমিককে নাকি এই ছুটির মাঝেই ছাঁটাই করা হয়েছে। এবং ছাঁটাইয়ের চিন্তা ভাবনা হচ্ছে। এই তথ্য জানিয়েছেন কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের মহাপরিদর্শক শিবনাথ রায়। তিনি এই ছাঁটাই প্রক্রিয়া বন্ধের অনুরোধ জানিয়ে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোতে চিঠিও দিয়েছেন। শ্রমিক নেতারা বলছেন, ঢাকা-টঙ্গী-উত্তরা-গাজীপুরের বেশ কিছু গার্মেন্টসের প্রায় ৩ হাজার শ্রমিককে ইতোমধ্যে ছাঁটাই করা হয়েছে।

এইসব তথ্য নিশ্চই শ্রমিকদের কাছে অজানা নয়। ভাসা ভাসা তথ্য তারাও হয়তো জেনেছেন। আর তাই মৃত্যু ভয় ভুলে গিয়ে ছুটে এসেছেন ক্ষুধার ভয়ে।দিনভর যখন মহাসড়কের এমন দৃশ্য দেখলাম তখন রাতে আবার শোনা গেলো বিজিএমই’র সভাপতি অনুরোধ করেছেন ১১ তারিখ পর্যন্ত কারখানা বন্ধ রাখার জন্য। কী একটা হযবরল অবস্থা!

প্রথম আলো পত্রিকার এক প্রতিবেদনে দিদার নামে এক পোশাক শ্রমিক বলেছেন, ‘গার্মেন্টস খুলবে তাই ফিরছি। এ পারে এসে শুনলাম কারখানার বন্ধ বাড়াবে। এখন ঢাকা যাব, নাকি ফিরে যাব, বুঝতে পারছি না।’

এই দেশের শ্রমজীবী মানুষেরা নিম্ন আয়ের মানুষেরা এমনই এক জীবন যে জীবন নিয়ে ইচ্ছে খুশিমত তামাশা করা যায়। যা খুশি তাই সিদ্ধান্ত নেয়া যায়। শ্রমিকদের জীবন বেঁচে থাকার আকাঙ্খা, ব্যথাবোধ বলতে যেন কিছু নাই। এসবই উপরতলার মানুষদের জন্য সংরক্ষিত। ‘স্টে হোম সেইফ হোম’ থিওরি চাইলেও এই শ্রমিকদের মাঝে কতটা মানা সম্ভব তা বিবেচনা না করেই তাদের নিয়ে অনেকে ঠাট্টা-তামাশাও করেন। যে শ্রমিকরা এক কক্ষে ৭ জন ঘুমায়, এক টয়লেট ব্যবহার করেন ১০/২০ পরিবার তারা কিভাবে ‘সামাজিক দূরত্ব’ ‘শারীরিক দূরত্ব’ বজায় রেখে চলবে? তাই কোয়ারেন্টাইনের অর্থ স্বভাবতই এই শ্রমিকদের বোঝার সুযোগ নাই।

আর সুযোগ নাই বলেই, তাদের জন্য রাষ্ট্র/কারখানার মালিকরা কোনো ব্যবস্থা না করলেও তারা অভিযোগ না তুলে জীবনকে ভাগ্যের হাতে তুলে দিয়ে তামাশা করার বস্তু বানিয়ে আসা-যাওয়া করে। পেটের ভেতর আগুন জ্বলে বলেই সব কিছু তারা সয়ে যায় মুখ বুঝে। এই আগুনের কাছেই বুঝি ফিকে হয়ে গেছে মৃত্যু ভয়ও!

লেখক: আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি, সাংবাদিক ও তথ্যচিত্র নির্মাতা