সাইফুর রহমানের গল্পগ্রন্থ ‘গুনিন’

ইফতেখার হোসাইন রাজু

ছোটগল্প সম্পর্কে এডগার অ্যালান পো বলেন, একটি মূলচরিত্র, একটিমাত্র ঘটনা, একক আবেগ অথবা একটি পরিস্থিতিবোধক কিছু ভাবাবেগ নিয়ে যৌক্তিক পরিণতির দিকে আবর্তিত হওয়াই ছোটগল্প। এর আরম্ভ ও উপসংহার হবে নাটকীয়। সর্বোপরি গল্পসমাপ্তির পরেও পাঠকের মনের মধ্যে এর গুঞ্জরণ চলতে থাকবে। এসব বৈশিষ্ট্য চমৎকার ভাবে ফুটে উঠেছে মোঃ সাইফুর রহমানের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘গুনিনে’।

মোট ২৩টি গল্পে সজ্জিত গল্পগ্রন্থটিতে রয়েছে রহস্য, থ্রিলার, রোমান্স, ট্র্যাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ধাঁচের গল্প। গল্পগুলোতে সমাজ ও জীবনের স্বরূপ প্রতিফলিত হয়েছে নানাভাবে। বিভিন্ন গল্পে উঠে এসেছে মানবতাবাদ ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা। কিছু গল্পে দেখা যায়, সমকালীন ঘটনার ব্যাপক প্রতিফলন এবং ব্যক্তিসত্তার নানামুখী বিশ্লেষণ। লেখক বিষয়বস্তু ও ভাষাশৈলীর ক্ষেত্রে এনেছেন নতুনত্ব।

বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের বাস্তবতা অপরূপ শিল্পরূপ লাভ করেছে তাঁর ‘বর্ষার সেই দিন’ গল্পে। তরুণ বজলুকে ঘিরেই আবর্তিত হয়েছে গল্পটি। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংসতা, রাজাকারের লুটপাট, সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উপর নিপীড়ন ও মুক্তিবাহিনীর দুঃসাহসিক অভিযানের চিত্র সুনিপুণভাবে চিত্রিত হয়েছে এই গল্পে।

সারোগেসির মতো নতুন একটি বিষয় ‘খুঁজি তোমায়’ গল্পের মাধ্যমে চমৎকারভাবে তুলে এনেছেন লেখক। কানামাছি গল্পে শহুরে মধ্যবিত্ত যুবক রাহাতের জীবন সঙ্কট আধুনিক শিল্পচেতনায় রহস্যময়ভাবে তুলে এনেছেন।

এক কাপ চা, সারপ্রাইজ, তুশির জন্য গল্পগুলো পড়ে মনে হবে, সমষ্টি মানুষের জীবনকেই রূপায়িত করার প্রতি অধিকতর মনোযোগী হয়েছেন লেখক। প্রতীকতা সৃষ্টিতে এবং সমাজজীবনের গভীরতা উন্মোচনে লেখকের সাফল্য অসাধারণ।

নতুন বর্ণনারীতি, ব্যতিক্রমধর্মী শব্দব্যবহার, কাব্যিক পরিচর্যা ইত্যাদির সফল ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায় ‘প্রিয়জন’ গল্পে । “মায়া” ও “অপেক্ষা” গল্পে প্রতীকতা ও পরাবাস্তবতার নিরিখে ব্যক্তি-সমাজের যোগসূত্র অনুসন্ধান তাঁর গল্পকে দিয়েছে বিশিষ্টতা।

গ্রাম-নগর উভয় প্রেক্ষাপটেই তিনি ছিলেন সাবলীল। তাঁর গুনিন গল্পটি কেবল প্রচলিত ধারার ব্যতিক্রমই নয়, সেখানে বাঙালীর জীবন চমৎকারভাবে বাঙময় হয়ে উঠেছে।

পরকীয়ার গল্প ‘ভালবাসার শ্বেত প্রহর’-এ নাভিদ এবং মিতু অনেকটা গিফ্ট অব মেজাই-এর জিম এবং ডেলা’র বিপরীতে এসে দাঁড়ায়। দুজনই দুজনকে খুন করতে চায়। একজন করেও। ‘হৃদিতা’ গল্পে হৃদিতাও চায় খুন করতে, হত্যা করতে। তবে তা বাস্তবে নয় গল্পে। গল্প লিখে চায় চমকে দিতে। পড়তে পড়তে মনে হবে, কোনো সিরিয়াল কিলারের গল্প পড়ছে পাঠক।

বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র মুহিব দীর্ঘদিন পেনিক সিনড্রোমে ভোগা অনেকটাই সত্যি মনে হয় ‘গল্পের মতোই সত্যি’ গল্পে। ‘নাফিজের খোঁজে’ গল্পে শেষ হবার আগে বোঝার উপায় নেই নাফিজ যে একটি পোষাপ্রাণী। ‘বাবা’ গল্পেও বোঝার সুযোগ নেই আকমল সাহেব একজন সোনা পাচারকারী। ‘সিঙ্গাপুর ফেরত আনোয়ার’ গল্পে আনোয়ারও তাই।সবশেষে বলা যায়, অভিষেক বইটি দিয়েই লেখক বাংলা সাহিত্যে তাঁর শক্তিশালী আগমনী বার্তা দিয়েছেন। গুনিন বইটি লেখকের দীর্ঘ সাহিত্য ইনিংস এ মাইলফলক হয়ে থাকবে।

বইটি পাওয়া যাবে: অমর একুশে গ্রন্থমেলার আফসার ব্রাদার্স এর ২৮৯-২৯২ নং স্টলে। এছাড়াও পাওয়া যাবে চট্টগ্রামের বাতিঘরে।

লেখক: জনসংযোগ কর্মকর্তা,নোবিপ্রবি।