আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর ৬টি সহজ ও কার্যকর উপায়

আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর উপায় জানা জরুরী কারণ, জীবনে বড় হতে হলে আত্মবিশ্বাস থাকাটা খুবই প্রয়োজনীয়। যদি নিজের প্রতি সত্যিকারের বিশ্বাস থাকে, তবে যে কোনও কাজে সফল হবেন, আর অন্যরাও আপনাকে বিশ্বাস আর সম্মান করবে।

আত্মবিশ্বাসের অভাব থাকলে কোনও কাজই ঠিকমত করা যায় না; সব সময়েই মনের মধ্যে ব্যর্থ হওয়ার ভয় কাজ করে। আর ভয় হলো জীবনে ব্যর্থতার সবচেয়ে বড় কারণ। ভয় নিয়ে নিচের উদাহরণটি খুব মন দিয়ে পড়ুন:

ধরুন একটি গুহার সামনে দুইজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। তারা জানে যে এই গুহার ভেতরে গুপ্তধন থাকতে পারে।

দু’জনের হাতেই একটি করে মশাল, তাদের শারীরিক শক্তিও প্রায় একই রকমের। কিন্তু তাদের একজন বিশ্বাস করে যে সে চেষ্টা করলে ভেতরের গুপ্তধন বের করে আনতে পারবে। অন্যজন গুহার ভেতরে কি কি বিপদ হতে পারে, তা নিয়ে চিন্তা করছে। কাজেই প্রথমজন গুহায় ঢুকলো এবং দ্বিতীয়জন ভয় পেয়ে বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকল। এখন ভেতরে যদি সত্যিই গুপ্তধন থাকে তাহলে সাহসী লোকটিই লাভবান হবে।

“যে গুহায় যেতে আমরা সবচেয়ে বেশি ভয় পাই, তার ভেতরেই সাধারনত সবচেয়ে দামী গুপ্তধন রয়েছে”। – এটি একটি প্রাচীন ইংরেজী প্রবাদ, যার অনেক বাস্তব প্রমাণ আছে।

জীবনে বড় কিছু করতে হলে তার জন্য কিছু ত্যাগ স্বীকার করতেই হবে। পৃথিবীতে কোনও কিছুই বিনা কষ্টে পাওয়া যায় না। কিন্তু এই সত্যটি সবাই জানলেও, আমরা সেই কষ্টটা করতে চাই না। কারণ কষ্ট করতে অথবা নতুন কোনওকিছু শুরু করতে আমরা বেশিরভাগ সময়ে ভয় পাই। আর এই ভয়ের প্রধান কারণ আত্মবিশ্বাসের অভাব।

‌আত্মবিশ্বাস সব সময়ে এক রকম থাকবে না – এটাই স্বাভাবিক। বিভিন্ন ঘটনা ও ব্যর্থতার কারণে আত্মবিশ্বাস কমে যেতে পারে। কিন্তু সত্যিকার আত্মবিশ্বাসী মানুষেরা খুব সহজেই হারানো আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারেন। এর জন্য তাঁরা বিভিন্ন উপায় অবলম্বন করেন। এই পদ্ধতিগুলো যে কোনও পরিস্থিতিতে তাঁদের আত্মবিশ্বাস ঠিক রাখতে সাহায্য করে।

আজ আমরা আত্মবিশ্বাস বাড়ানোর এমনই ৬টি উপায় আপনাকে বলব, যার মাধ্যমে আপনি খুব সহজেই আপনার আত্মবিশ্বাস বাড়াতে পারবেন।

০১. নিজের দায়িত্ব নিজে নিন

১৯৬৭ সালে বিখ্যাত গবেষক মার্টিন স্যালিগম্যান কুকুর নিয়ে একটি গবেষণা করেন। তিনি বেশ কয়েকদিন ধরে কয়েকটি পোষা কুকুরকে অল্প করে ইলেক্ট্রিক শক দিতে থাকেন। প্রতিবার শক দেয়ার আগে তিনি একটি ঘন্টা বাজিয়ে কুকুরদের শোনাতেন। কয়েকদিন পর এমন হলো যে শুধু ঘন্টা বাজালেই কুকুরগুলো ভয়ে পেয়ে যেত, কারণ তাদের ধারণা হয়ে গিয়েছিল, ঘন্টা বাজানোর পরই তাদের শক দেয়া হবে। এর পর থেকে, কুকুর গুলোকে ভয় দেখানোর জন্য শুধু ঘন্টা বাজালেই চলতো। শক দেয়ার যন্ত্রটি সরিয়ে ফেলার পরও তারা ঘন্টা শুনে ভয় পেতো।

এই পরীক্ষা থেকে স্যালিগম্যান একটি নতুন তত্ত্ব আবিষ্কার করলেন, যার নাম “Learned Helplessness” অর্থা‌ৎ ইচ্ছা করে কাউকে মানসিক ভাবে অসহায় করে ফেলা। আমরা নিজেরাও অনেক সময়ে ইচ্ছা করে নিজেদের অসহায় করে ফেলি। আমরা জানিও না যে আমরা এটা করেছি।

অতীতে কোনও কাজ করতে গিয়ে যদি একবার ব্যর্থ হই, পরে আবার সেই কাজ করতে আমরা ভয় পাই। কারণ আগের ব্যর্থতা আমাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে ফেলেছে। ওই কাজের কথা ভাবতে গেলেই আমাদের কুকুরের ঘন্টা শোনার মত অবস্থা হয়। শক দেয়া না হলেও তারা যেমন ঘন্টা শুনেই ভয়ে অস্থির হয়ে যায় – আমরাও যে কাজ করে আগে ব্যর্থ হয়েছি, তার কথা ভাবলেই আবার ব্যর্থ হবার ভয় পাই। আমরা ধরেই নিই যে ওই কাজ আবার করতে গেলে আমরা আবার ব্যর্থ হব। আমরা ভেবেও দেখি না, যে যেসব কারণে আগেরবার ব্যর্থ হয়েছিলাম – সেই কারণ এখনও আছে কি-না; অথবা সেই কারণ আমরা নিজেরা দূর করার চেষ্টাও করি না।

শক দেয়ার যন্ত্রটি সরিয়ে ফেলার পরও কুকুরগুলো যেমন ঘন্টা শুনে ভয় পেত। তেমনি বিপদ কেটে যাওয়ার পরও মানুষ বিপদের ভয়ে অস্থির হয়ে থাকে।

খারাপ পরিস্থিতিতে পড়ে তার সামনে আমরা হার মেনে নিই – আমরা ধরেই নিই যে পরিস্থিতির নিয়ন্ত্রণ আমাদের হাতে নেই।

কিন্তু সত্যি হচ্ছে আমরা যদি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে নিজেরাই নিজেদের দায়িত্ব নিই, এবং বুদ্ধি খাটিয়ে খারাপ পরিস্থিতিকে বদলানোর চেষ্টা করি, তাহলে সেই অবস্থা পরিবর্তন করা সম্ভব। যদি নিজের জ্ঞান বা দক্ষতার অভাবে আগেরবার ব্যর্থ হয়ে থাকেন, নতুন করে শিখে আবার সেই কাজ করলে আপনি নিশ্চই সফল হবেন। কিন্তু ভয় ও আত্মবিশ্বাসহীনতার কারণে আমরা অনেক সময়েই এই সহজ সমাধানটি কাজে লাগাই না।

কাজেই আপনার জীবনে যে সমস্যাই আসুক, এবং তার কারণ যা-ই হোক, তা পরিবর্তন করার ১০০ ভাগ দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিতে শিখুন। যদি কোনও কিছুতে ব্যর্থ হন, তবে তার জন্য আপনার কি কি ভুল ছিল, তা ভেবে বের করুন। নিজেকে আবার প্রস্তুত করুন।

বিশ্বাস করুন, আপনার জীবনের নিয়ন্ত্রণ আপনার নিজের হাতে, এবং সেই বিশ্বাস অনুযায়ী কাজ করতে থাকুন। এভাবে আপনি জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে বড় সাফল্য তো পাবেনই, সেই সাথে আপনার আত্মবিশ্বাস ও আত্ম সম্মান অনেক বেড়ে যাবে।

০২. জীবনের একটি উদ্দেশ্য খুঁজে বের করুন এবং সেই পথে চলুন

আপনি যদি না জানেন যে, আপনি জীবনে কি করতে চান – তবে জীবনে কিছু করা আসলেই কঠিন। আমরা ছোটবেলায় রচনাতে পড়েছি: “লক্ষ্যহীন জীবন, মাঝিহীন নৌকার মত” । রাস্তায় বের হয়ে খেয়াল করলে দেখবেন, সেখানে সবাই কোনও না কোনও উদ্দেশ্য নিয়ে চলছে। কেউ স্কুলে যাচ্ছে, কেউ অফিসে যাচ্ছে, কেউ রাস্তায় কিছু বিক্রী করছে – সবারই একটা উদ্দেশ্য আছে। আবার কিছু মানুষকে দেখলেই বোঝা যায় – এদের কোনও উদ্দেশ্য নেই, কোনও কাজ ছাড়াই রাস্তায় বসে আছে। এমন একজনকে যদি জিজ্ঞাসা করেন যে সে কোথায় যাবে, তবে সে কোনও উত্তর দিতে পারবে না। এদের যদি আপনি কোথাও নিয়ে যেতে চান, আপনার সাথে সে চলেও আসতে পারে। মূল কথা হচ্ছে, আপনার যদি নিজের কোনও লক্ষ্য না থাকে, তবে অন্যরা আপনাকে চালানোর সুযোগ পেয়ে যাবে।

এখন রাস্তার এই ব্যাপারটিকে পুরো সমাজ হিসেবে কল্পনা করুন। কাউকে যদি জিজ্ঞাসা করেন, সে চাকরি কেন করে, তবে অনেকেই উত্তর দেবে যে, সবাই করে বলে সে-ও করে। চাকরি না করলে সমাজের মানুষের চোখে ছোট হয়ে থাকতে হয়।

আমাদের সমাজের বেশিরভাগ মানুষ জীবন চালায় অন্যদের কথায়; সমাজ তাদের যা শেখায়, যা বলে – তারা সেভাবেই চলে। তাদের নিজের কোনও উদ্দেশ্য থাকে না। কিন্তু যখন তারা কোনও একটি বড় সমস্যায় পড়ে, তখন সমাজ তাদের কোনও সাহায্য করে না – এবং তারা নিজেরাও কোনও সমাধান বের করতে পারে না।

নিজের এই ব্যর্থতার জন্য তখন তারা তাদের আশপাশের মানুষ আর ভাগ্যকে দোষ দেয়। অথচ দোষ তাদের নিজেদের। তারা নিজেদের মত করে কোনও পরিকল্পনা করে না, নিজেদের জীবনের কোনও উদ্দেশ্যও ঠিক করে না। সোজা কথায়, বেশিরভাগ মানুষেরই কোনও প্যাশন নেই।

স্কুল-কলেজ থেকে শুরু করে কর্মক্ষেত্র, ব্যক্তিগত জীবন – সবখানেই এক চিত্র। অন্যদের কথায় চলতে চলতে আমরা নিজের সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা আর অধীকারের কথাই ভুলে যাই। আর এভাবে নিজের ওপরে বিশ্বাস হারিয়ে ফেলি।

তাই আমাদের সবার উচি‌ৎ, নিজের জীবনের একটি উদ্দেশ্য ঠিক করা, এবং সেদিকে এগিয়ে যাওয়া। নিজেকে প্রশ্ন করুন, আপনি যা করছেন, যা ভাবছেন, আপনার জীবনকে যেখানে দেখতে চাচ্ছেন – এসব কি আপনার নিজের চাওয়া? নাকি সমাজ বা অন্য কারও প্রভাবে প্রভাবিত?

যদি তাই হয়, তবে চেষ্টা করুন নিজের মত করে চলার, নিজের মত করে জীবনের লক্ষ্য ঠিক করার। পরিকল্পনা করুন, সেই উদ্দেশ্যে পোঁছাতে আপনি কি কি করবেন – নিজের জ্ঞান ও দক্ষতায় ভর করে প্ল্যান সাজান এবং সেই অনুযায়ী কাজ করুন। নিজের ইচ্ছেগুলো যখন নিজের চেষ্টায় পূরণ করবেন, দেখবেন নিজের ওপরে আপনার একটি দৃঢ় বিশ্বাস জন্মেছে।

৩.কথা ও কাজে মিল রাখুন

ধরুন আপনার দুইজন পরিচিত লোক আছে।  প্রথমজন কি করবে – না করবে এইসব ব্যাপারে সারাদিন শুধু কথা বলে। কিন্তু কথা অনুযায়ী কাজ করে না। আরদ্বিতীয়জন যা বলে, সত্যিসত্যিই তা করে দেখায়। – আপনার কাছে কাকে বেশি আত্মবিশ্বাসী মনে হয়?

ধরা যাক আপনি মনে প্রাণে বিশ্বাস করেন এব‍ং মুখে বলেন বলেন যে, অন্য কারও জিনিস অন্যায় ভাবে দখল করা ঠিক নয়। এখন আপনি যদি নিজের লাভের জন্য অন্যের সাথে প্রতারণা করেন, অথবা অন্যায় ভাবে অন্যের জিনিস দখল করেন – তবে আপনি নিজের কাছেই ছোট হয়ে যাবেন।

নিজের বিশ্বাসন ও কথার বিপরীত কাজ করার কারণে আপনি নিজের চোখেই অনেক নিচে নেমে যাবেন। সেই সাথে, যাদের কাছে এইসব কথা বলেছেন, তাদের কাছে আপনার সম্মান একদম শেষ হয়ে যাবে। ফলে আত্মবিশ্বাস নষ্ট হবে।

কথা ও কাজে মিল রাখাটা আত্মবিশ্বাস ধরে রাখার জন্য খুবই জরুরী – এতে যেমন নিজের প্রতি সম্মান থাকে, সেই সাথে অন্যরাও আপনাকে সম্মান করবে।

৪. সচেতন ভাবে বাঁচুন-

ধরুন একজনের সাথে আপনি কাজের ব্যাপারে খুব জরুরী কিছু আলোচনা করছেন। তিনি আপনাকে কিছু একটা বোঝাচ্ছেন। আপনিও বুঝতে পারছেন। কিন্তু মাঝেমাঝেই লোকটির ফোনে মেসেজ আসছে, আর তিনি ‘excuse me’ বলে মেসেজ চেক করছেন। কয়েকবার এরকম হওয়ার পর অবশ্যই আপনার তার কথা শোনার আগ্রহ নষ্ট হয়ে যাবে। অর্থা‌ৎ লোকটি ভালো পারফর্মেন্স করতে পারলো না। করতে না পারার কারণ, আপনার সাথে কথা বলার সময়ে তাঁর পুরো মনযোগ কথা বলার দিকে ছিল না।

প্রতিদিন যে রাস্তা দিয়ে আপনি কাজে বা কলেজ-ভার্সিটি যান, সেই রাস্তায় অনেক কিছুই আছে যা কোনওদিন আপনার চোখে পড়েনি। কিন্তু সেগুলো সব সময়ে চোখের সামনেই থাকে। কাল কাজে অথবা পড়তে যাবার সময়ে খুব মন দিয়ে রাস্তার আশপাশে দেখার চেষ্টা করুন। – দেখবেন এমন অনেক দোকান, গাছ, অফিস, দালান চোখে পড়েবে – যা আপনি আগে দেখেননি। কিন্তু সেগুলো সব সময়ে সেখানেই ছিল। বহুদিন ধরে সেই রাস্তায় চলার পরও সেগুলো আপনার চোখে পড়েনি। ব্যাপারটা যখন আপনি বুঝতে পারবেন – আপনার নিজেরই অবাক লাগবে।

এটা হওয়ার কারণ, আমরা বেশিরভাগ সময়টাই অসচেতন ভাবে পার করি। আমাদের চোখ খোলা থাকে, কিন্তু আমাদের মন থাকে অন্য কোথাও। আপনি হয়তো রাস্তা দিয়ে চলছেন, কিন্তু আপনার মন পড়ে আছে অফিসের কাজে, বা বাসার ঝামেলায়।

একটি ছোট্ট উদাহরন দেয়া যাক – আপনার হয়তো কখনও এমনটা হয়েছে, ক্লাসে বা মিটিংয়ে জরুরী কোনও কথা হচ্ছে – এবং অনেকটা সময় ধরে আপনার চিন্তা অন্য কোথাও হারিয়ে গেছে – হয়তো রুমের বদলে নিজেকে খোলা মাঠে কল্পনা করছেন। এমনকি চোখ খোলা থাকলেও সামনে থাকা ঘটনার বদলে অন্য কিছু দেখছেন। আশপাশে যে শব্দগুলো হচ্ছে – সেগুলো মোটেও শুনতে পাচ্ছেন না। একটু পর কোনও কারণে আপনার মনযোগ বর্তমানে ফিরলে মনে হয় এইমাত্র ঘুম থেকে জেগে উঠলেন।

এর একটি বড় কারণ, এই যান্ত্রিক একঘেয়ে জীবন আমাদের অনেকটা রোবটের মত বানিয়ে ফেলে। সব সময়ে একই ঘটনার মধ্য দিয়ে যেতে যেতে, একই কাজ প্রতিদিন করতে করতে একটা পর্যায়ে মন অন্য কোথাও হারিয়ে যেতে চায়।

আর সব সময়ে করতে থাকার ফলে আমাদের প্রতিদিনকার রুটিনমাফিক কাজগুলো অভ্যাসে পরিনত হয়। সেগুলো আপনা আপনিই হতে থাকে। আপনার শরীর একখানে থাকে তো মন পড়ে থাকে অন্য কোথাও। ঘরে থাকলে মন অফিসের চিন্তায় হারিয়ে যায়; অফিসে থাকলে মন ঘরের চিন্তায় হারিয়ে যায়।

পরিবার নিয়ে হয়তো আপনি বাইরে কোথাও বেড়াতে গেছেন, কিন্তু সামনে নিজের স্ত্রী-সন্তানদের দেখার বদলে বসের বা কর্মচারীদের চেহারা দেখতে শুরু করে দিয়েছেন। আবার অফিসে কাজ করার সময়ে বাসার চিন্তা মাথায় চলে আসে। আর এই কারণে ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে খারাপ প্রভাব পড়ে।

এই অভ্যাসের ফলে আপনার কোনও কাজই ঠিকমত হয় না। আপনি বুঝতেও পারেন না যে, কি কারণে আপনার পারফরমেন্স দিন দিন খারাপ হচ্ছে। ফলে আত্মবিশ্বাসে ফাটল ধরে।

সমাধান:

ইংরেজীতে একটা কথা আছে: “make every moment your best moment” -মানে প্রতিটি মূহুর্তকে সেরা মূহুর্ত বানান। এটা করতে হলে প্রথমেই আপনাকে সচেতন হতে হবে। যখনই দেখবেন আপনার মন বর্তমান কাজের চিন্তা বাদ দিয়ে অন্য কোনও চিন্তা করা শুরু করেছে – সেই মূহুর্তে নিজেকে আবার বাস্তবে ফিরিয়ে আনুন। রাস্তায় চলার সময়ে অন্যকিছু না ভেবে, রাস্তার জিনিসগুলো খেয়াল করুন। পাশ দিয়ে যাওয়া গাড়িগুলোর রং কি, রাস্তার পাশে লাগানো গাছ গুলোয় কি কি রং এর ফুল ফুটেছে – এসব মন দিয়ে দেখুন। আপাতত এটা কাজের মনে না হলেও, এটা প্রাকটিস করলে অন্য জায়গাতেও আপনি সচেতন থাকতে পারবেন। অফিসের কাজের সময়েও মনযোগ বেড়ে যাবে। ইংরেজীতে যাকে বলে “Live at the moment”.

এই মূহুর্তে যে কাজটি করা সবচেয়ে জরুরী, সেটা বাদে বাকি সবকিছু বাদ দিন। যদি অন্য কোনও আইডিয়া বা চিন্তা মাথায় আসে, যেটা আসলেই গুরুত্বপূর্ণ – তাহলে হাতের কাছে ছোট একটি খাতা বা প্যাড রাখুন। সংক্ষেপে সেটি লিখে রাখুন, যাতে তা নিয়ে পরে চিন্তা করা যায়।

ধরুন আপনি একটি কোম্পানীতে কাজ করেন, যেটা ঘড়ি আর মোবাইল বানায়। এই মূহুর্তে আপনি মোবাইলের একটি প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করছেন। এখন যদি ঘড়ি নিয়ে দারুন একটি আইডিয়া মাথায় চলে আসে, সেটা নিয়ে চিন্তায় ডুবে যাবেন না। ঘড়ির চিন্তায় ডুবে গেলে, মোবাইল নিয়ে এখন যে কাজটি করছেন – সেই কাজটির পারফরমেন্স খারাপ হয়ে যাবে। হাতের কাছে রাখা ছোট খাতায় ঘড়ির বিষয়ে মাথায় আসা নতুন আইডিয়াটি লিখে রাখুন। লেখা শেষ হলে আগের কাজে ফিরে যান। লিখে রাখার ফলে আইডিয়া ভুলে যাবার ভয় থাকবে না, এবং আপনি পূর্ণ সচেতনতার সাথে এই মূহুর্তে যেটা করছেন সেটা করতে পারবেন।

কোনও কাজের মধ্যে থাকার সময়ে মোবাইল ফোনে আসা মেসেজ, কম্পিউটারে আসা নোটিফিকেশন – এসব চেক করবেন না। এগুলোও মনযোগ নষ্ট করে। আপনার অফিস টাইম যদি হয় ৮ ঘন্টা, তবে এই ৮ ঘন্টা শুধু অফিসের কাজই করুন। যদি অন্য কোনও কাজের চিন্তা মাথায় আসে, তবে সেই ছোট খাতাটিতে লিখে রাখুন, এবং সেটা নিয়ে অফিসের পরে চিন্তা করুন। অফিস টাইমে ওসব নিয়ে ভাবতে গেলে, অফিসের পারফরমেন্স খারাপ হতে বাধ্য।

আপনি যখন অন্য সবকিছুর চিন্তা বাদ দিয়ে, এই মূহুর্তে যেটা করা সবচেয়ে জরুরী, সেটাতে মন দিতে পারবেন – তখন দেখবেন, আপনার সব কাজ এমনিতেই ভালো হচ্ছে। আর পারফরমেন্স ভালো হবার সাথে সাথে আপনার আত্মবিশ্বাসও বাড়তে শুরু করবে।

৫. নিজের সীমাবদ্ধতাকে মেনে নিন-

কিশোর বয়সী ছেলেমেয়েরা নিজের চেহারা ও শারীরিক গঠন নিয়ে অনেক বেশি চিন্তা করে। এই সময়ে চেহারায় ও শরীরে কিছু পরিবর্তন আসে। অনেকের ক্ষেত্রেই দেখা যায় কিছু দিনের জন্য মুখে ব্রণ বা আঁচিল জাতীয় কিছু হয়।

এটা খুবই সাময়িক ব্যাপার, কিন্তু অনেক ছেলেমেয়ে এটা জেনেও নিজেদের চেহারার এই দাগের কারণে মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। ভিভিন্ন ধরনের অষুধ ও কসমেটিকস ব্যবহার করতে শুরু করে, যার বেশিরভাগই আসলে কোনও কাজের না। একটা সময়ে অনেকে মানুষের সামনে যাওয়াই বন্ধ করে দেয়। নিজেকে অকারণে ছোট ভাবতে ভাবতে এক সময়ে এটি তাদের আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে ফেলে। এর ফলে অনেকেরই সফল হওয়ার সম্ভাবনা নষ্ট হয়ে যায়।

বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে, অন্যের কাছে আকর্ষনীয় হওয়ার জন্য একজন মানুষের চেহারা, উচ্চতা, গায়ের রং – ইত্যাদির চেয়ে, তার আত্মবিশ্বাস ও আচরণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন মানুষ যদি নিজের lacking বা সীমাবদ্ধতাগুলোকে মেনে নিয়ে সেগুলোকেই নিজের আত্মবিশ্বাসের ভিত্তি হিসেবে কাজে লাগায়, তবে সেটাই তাদের মূল আকর্ষণ হয়ে যায়।

বিখ্যাত লেখক জর্জ আর.আর. মার্টিন তাঁর “দি সং অব আইস এ্যান্ড ফায়ার: এ গেম অব থ্রোনস” উপন্যাসে লিখেছেন: “নিজের সীমাবদ্ধতা নিয়ে লজ্জা করো না। একে তোমার শক্তি বানাও….. ঢাল হিসেবে ব্যবহার করো। তাহলে আর অন্যকেউ এটা তোমার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে না”

তবে এখানে একটি কথা আছে সব ধরনের সীমাবদ্ধতাকে চোখ বন্ধ করে মেনে নিলে আবার বোকামি করবেন।

আমাদের জীবনে দুই ধরনের সীমাবদ্ধতা আছে। এক, যেগুলো আমরা চাইলেও পরিবর্তন করতে পারব না; দুই, যেগুলো আমরা চেষ্টা করলে পরিবর্তন করতে পারি।

উদাহরন হিসেবে ধরা যাক, আপনি ২০ কেজি ওভারওয়েট; যা আপনার আপনার চলাফেরা ও শারীরিক সুস্থতার জন্য খারাপ। খাওয়া দাওয়া নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যায়াম করার মাধ্যমে এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সম্ভব। কিন্তু এই ব্যাপারে কিছু না করে যদি বলেন যে “আমি যেমন আছি ভালো আছি, আমার পরিবর্তনের দরকার নেই” – তাহলে ধরে নিতে হবে, আপনি আসলে অলস। কাজেই এই ক্ষেত্রে উচি‌ৎ হবে নিজের অবস্থা বদলানোর জন্য কাজ শুরু করা।

অন্যদিকে আপনার উচ্চতা যদি কম হয়, এই ব্যাপারে আপনি কিছুই করতে পারবেন না। তাহলে ব্যাপারটিকে মেনে নিন এবং নিজেকে বলুন – “আমার উচ্চতা কম, তাতে কোনও সমস্যা নেই, আমি পৃথিবীকে দেখিয়ে দেব মানুষের শারীরিক উচ্চতার চেয়ে মানুষের কাজ ও চিন্তাই তাকে বড় করে” একজন মানুষের উচ্চতা কম হলে তার শরীরের শক্তি ও মাথার বুদ্ধি কম হয় না। কম উচ্চতা নিয়েও একজন মানুষ একজন লম্বা মানুষের সমান শক্তি আর বুদ্ধি রাখে। সেগুলো খাটিয়ে আপনি পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা মানুষের চেয়েও সফল হতে পারবেন।

শচীন তেন্দুলকার, মেসি, টম ক্রুজ – এরা সবাই বলতে গেলে খাটো মানুষ – কিন্তু নিজেদের কাজের ক্ষেত্রে সেরা হয়ে এরা সবাই লিজেন্ড। সেই সাথে, হয়েছেন অন্যদের প্রেরণার উ‌ৎস – আপনি কেন তা পারবেন না?

৬. নিজের অধিকারের ব্যাপারে সচেতন হোন এবং অধিকার আদায় করুন-

অধিকার আদায়ের দিক বিবেচনা করলে, পৃথিবীতে দুই ধরনের মানুষ আছে। এক, নিরীহ; দুই, আক্রমণাত্মক বা attacking।

মনে করুন, আপনি ট্রেনের টিকিট কাটার জন্য অনেক সময় ধরে লাইনে অপেক্ষা করছেন। একটু পরে এক লোক এসে লাইন ভেঙে সামনে দাঁড়িয়ে গেল। আপনি যদি নিরীহ ধরনের মানুষ হন, তবে হয়তো তাকে বলবেন না। শুধু মনে মনে তার ওপর রাগ করবেন।

আর যদি আপনি আক্রমণাত্মক ধরনের মানুষ হন, তবে আপনি লোকটির অন্যায় আচরনের প্রতিবাদ করবেন এবং চেঁচামেচি করে সেই লোকটিকে লাইন থেকে বের করে দেয়ার চেষ্টা করবেন।

নিরীহ মানুষ আসলে এমন মানুষ যারা কিনা সহজে কাউকে ‘না’ বলতে পারে না। নিজের কাজের ক্ষতি করে তারা অন্যের কাজ করে দেয়। নিজের অফিস বা ক্লাসে যেতে দেরি হয়ে গেলেও আরেকজনের জন্য পথে দাঁড়িয়ে থাকে।

এমন মানুষ রেস্টুরেন্টে টাকা দিয়ে খেতে বসে, তারপর পুড়ে যাওয়া বা বাসি খাবারও চুপচাপ খেয়ে নেয়। খাবারের ব্যাপারে অভিযোগ করেনা।

নিরীহরা আসলে এমন ধরনের মানুষ যারা সব সময়ে যা অন্যরা তাকে করতে বলে, তাই করে।

অন্যদিকে আক্রমণাত্মক মানুষেরা হল এমন ধরনের মানুষ, যারা নিজের ইচ্ছায় চলে, নিজে যেটা ভাল মনে করে সেই অনুযায়ী কাজ করে। অন্যের কথায় তাদের কিছুই যায় আসে না। রেস্টুরেন্টে গিয়ে যদি খাবার ঠিকমত না পায়, তাহলে তারা চেঁচামেচি করে পুরো রেস্টুরেন্ট মাথায় করে ফেলে।

এখন প্রশ্ন হল, আপনার কেমন হওযা উচি‌ৎ? নিরীহ, নাকি আক্রমণাত্মক?

উত্তর হলো – কোনওটাই না!

সব সময়ে যদি নিরীহ আচরন করেন তাহলে সবাই আপনাকে পেয়ে বসবে। আপনাকে দিয়ে ইচ্ছার বিরুদ্ধে কাজ করিয়ে নেবে। নিজের ইচ্ছাতে কিছুই করতে পারবেন না।

আবার যদি আক্রমণাত্মক ধরনের মানুষ হন, তাহলে অন্যদের কাছে আপনি একজন মেশার অযোগ্য মানুষ হিসেবে নিজেকে তুলে ধরবেন এবং আপনাকে কেউ পছন্দ করবে না।

তাহলে? – আপনার যেটা করা উচি‌ৎ সেটা হচ্ছে নিজের অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া। একজন অধিকার সচেতন মানুষ অন্যদের জন্য বিরক্তি বা অসুবিধার সৃষ্টি না করেই নিজের কাজটি আদায় করতে পারেন।

ধরুন একজন অধিকার সচেতন মানুষ রেস্টুরেন্টে খেতে যদি দেখেন যে, তাঁকে বাসি অথবা পুড়ে যাওয়া খাবার দেয়া হয়েছে। তিনি সেখানে চেঁচামেচি না করে ওয়েটারকে ডেকে ভদ্র ভাবে খাবারটি বদলে দিতে বলবেন।

একজন অধিকার সচেতন মানুষ নিজের মনমত কাজ করেন ঠিকই, কিন্তু তিনি কারও সাথে খারাপ আচরন করেন না। এই আচরনের মাধ্যমে অধিকার সচেতন মানুষেরা নিজেদের কাজ আদায় করার পাশাপাশি অন্যদের কাছ থেকে সম্মানও পান। এই ধরনের আচরণ করলে আপনার মাঝে একটি শক্তিশালী আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হবে।

শেষ কথা

উপরে বলা ৬টি পরামর্শ নেয়া হয়েছে Nathaniel Branden এর বেস্ট সেলার বই “Six Pillars of Self-Esteem” থেকে। অনেকেই এই বইয়ের পরামর্শগুলো মেনে চলে নিজেদের জীবনকে বদলে ফেলেছেন।

আপনি আপনার জীবনে কতটা উন্নতি করবেন, কতটা অর্থ বা খ্যাতি অর্জন করবেন, সংসার ও পারিবারিক জীবনে কতটা সুখী হবেন, তার অনেকটাই নির্ভর করে আপনার আত্মবিশ্বাস আর আত্মসম্মানের ওপর। নিজের ব্যাপারে কেমন অনুভব করেন, নিজের ব্যাপারে আপনার ভাবনা কি – এসব আপনার জীবনে এগিয়ে চলার জন্য অনেক বেশি জরুরী বিষয়।

যদি কখনও প্লেনে চড়ে থাকেন, তাহলে দেখে থাকবেন, ফ্লাই করার আগে প্রতিবার একজন এয়ার হোস্টেজ এসে সবাইকে একটি পরামর্শ দিয়ে থাকে। যদি কোনও প্রকারের জরুরী অবস্থা দেখা দেয় – তাহলে প্রত্যেক যাত্রী যেন নিজের অক্সিজেন মাস্কটি আগে পরে নেয়। এমনকি পাশে যদি নিজের সন্তানও বসে থাকে – তবুও যেন নিজের মাস্কটিই আগে পরেন।

এর কারণ, প্লেন দুর্ঘটনায় পড়লে যাত্রীরা মাস্ক পরার জন্য মাত্র ৩ সেকেন্ড সময় পান । একজন যদি নিজের মাস্ক পরতে না পারে, তাহলে পাশের জনকেও সাহায্য করা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়বে – সেক্ষেত্রে তার নিজের সাথে সাথে পাশের জনের জীবনও ঝুঁকিতে পড়বে। সেভাবেই যদি অন্যকে উ‌ৎসাহিত করা ও সাহস দেয়ার আগে নিজেকে নিজে উ‌ৎসাহিত করুন, নিজের মাঝে সাহসের জন্ম দিন – তখন দেখবেন আপনার উপস্থিতিই অন্যদের মাঝে সাহস ও উ‌ৎসাহের জন্ম দিচ্ছে।

আগে যদি আমরা নিজেরা ঠিক না হই, নিজের চোখে নিজেকে বড় না করি, তাহলে অন্যদের চোখেও বড় হতে পারব না। সবার আগে নিজের প্রতি নিজের বিশ্বাস বাড়িয়ে নেয়াটা সবচেয়ে জরুরী। যে মানুষের নিজের ওপর ভরসা নেই, অন্যরাও তার ওপর ভরসা করতে ভয় পায়।

আশা করি এই লেখার ৬টি টিপস আপনার কাজে লাগবে। লেখাটি যদি ভাল লেগে থাকে তবে লাইক ও কমেন্টের মাধ্যমে তা জানিয়ে আমাদের উ‌ৎসাহিত করবেন। যদি আপনার মনেহয় এই পরামর্শগুলো আপনার আশপাশের কারও কাজে লাগতে পারে, তবে তা অবশ্যই শেয়ার করুন।

নিজের ওপর বিশ্বাস রেখে সফলতার পথে এগিয়ে যান। আপনার সাফল্যেই আমাদের সার্থকতা।

TopUP