Categories
দেশ বরিশাল

নোয়াখালীর ঐতিহ্য ও গুণীজনের নামকরন ইতিহাস।।

মোঃইব্রাহিম নোয়াখালী প্রতিনিধি।

মেঘনার অববাহিকায় বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেষে জন্ম নেওয়া নোয়াখালী। নোয়াখালী, ফেনী ও লক্ষীপুর নিয়ে এক সময় ছিল মহকুমা। নোয়াখালীর নামকরণ, ভাষা, নোয়াখালী আলোকিত গুণীজন, জেলার দর্শনীয় স্থান ও নোয়াখালীর প্রিয় খাবার নিয়ে বিস্তারিত তুলে ধরার হলো –
নোয়াখালীর নামকরণ ইতিহাস।
এ জেলার আদি নাম ভুলুয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে একবার ত্রিপুরার পাহাড় থেকে প্রবাহিত ডাকাতিয়া নদীর পানিতে ভুলুয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চল ভয়াবহভাবে প্লাবিত হয় এবং এতে ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ থেকে পরিত্রাণের জন্য ১৬৬০ সালে একটি বিশাল খাল খনন করা হয়। এই বিশাল নতুন খালকে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষায় “নোয়া (নতুন) খাল” বলা হতো, এর ফলে অঞ্চলটি এক সময়ে লোকের মুখে মুখে পরিবর্তিত হয়ে “নোয়াখালী” হিসাবে পরিচিতি লাভ করতে শুরু করে।
১৭৭২ সালে জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিংস এদেশে প্রথম আধুনিক জেলা প্রশাসন ব্যবস্থা প্রবর্তনের প্রচেষ্টা নেন। তিনি বাংলাদেশকে ১৯টি জেলায় ভাগ করেন। এ ১৯টি জেলার একটি ছিল কলিন্দা। এ জেলাটি গঠিত হয়েছিল মূলত নোয়াখালী অঞ্চল নিয়ে।
১৭৮৭ সালে পুনরায় সমগ্র বাংলাদেশকে ১৪টি জেলায় ভাগ করা হয়। এর মধ্যে ভুলুয়া নামে নোয়াখালী অঞ্চলে একটি জেলা ছিল।
তৎকালে শাহবাজপুর, হাতিয়া, নোয়াখালী, লক্ষ্মীপুর ,ফেনী , ত্রিপুরার কিছু অংশ, সন্দ্বীপ ও মীরসরাই নিয়ে ছিল ভুলুয়া পরগনা। ১৮২১ সালে ভুলুয়া নামে স্বতন্ত্র জেলা প্রতিষ্ঠার পূর্ব পর্যন্ত এ অঞ্চল ত্রিপুরা জেলার অন্তর্ভূক্ত ছিল। ১৮৬৮ সালে ভুলুয়া জেলাকে নোয়াখালী জেলা নামকরণ করা হয়।
নোয়াখাইল্যা ভাষার যত কথা-
অনেকেই রসিকতা করে বলেন, চাঁদেও নাকি নোয়াখালীর মানুষ আছে। রূপক অর্থেই কথাটি বলা হয়। তবে এর একটা ভৌগোলিক ও নৃতাত্ত্বিক কারণও রয়েছে। নোয়াখালী অঞ্চলের মানুষ আর এর ভাষা নিয়ে দেশের অন্য অঞ্চলের লোকজনদের মধ্যে এক দারুণ কৌতুহল রয়েছে। নানান মুখরোচক গল্পও প্রচলিত আছে এ জেলাকে নিয়ে। সারাদেশে তো বটেই সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে নোয়াখালীর মানুষ।
এ অঞ্চলের ভাষার সঙ্গে মিশে গেছে গ্রিক, ইংরেজি, ল্যাটিন, পর্তুগিজসহ নানান ইউরোপীয় ভাষা। সেই সাথে আরবি ফারসি তো রয়েছেই। ফলে নানান ভাষার মিশেল এক অনন্য বৈশিষ্ট্যের রূপ নিয়েছে নোয়াখালীর ভাষায়। প্রায় এক কোটি মানুষ এ ভাষায় কথা বলে। বৃহত্তর নোয়াখালী ছাড়াও কুমিল্লা, লাকসাম, চৌদ্দগ্রাম, চাঁদপুরের কিছু এলাকা, ভোলা, চট্টগ্রামের মিরসরাই সীতাকুন্ড ও সন্দ্বীপের মানুষ এ ভাষাটিকেই ব্যবহার করছে।
নোয়াখালীর ভাষার মধ্যে রয়েছে অন্য এক মাদকতা। এ অঞ্চলের বিভিন্ন এলাকার ভাষার মধ্যেও রয়েছে নানান বৈচিত্র্য। নানান কথায় নানান রসিকতায় এ ভাষা প্রাঞ্জল হয়ে ওঠে। যে কোনো উৎসব পার্বণে এ ভাষাতে চলে নানান রসিকতার আয়োজন।
এ ভাষায় প্রচুর গান নাটক লেখা হয়েছে। যেগুলো একেবারে নোয়াখালীর আঞ্চলিক ভাষাতেই রচিত হয়েছে। সেগুলোর জনপ্রিয়তাও প্রচুর। বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে প্রচারিত নোয়াখালী ভাষার নাটকগুলো বিভিন্ন দর্শকদের মাঝে ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করেছে। নোয়াখালী ভাষার এক নিবেদিত সাধক অধ্যাপক মো. হাশেম এ অঞ্চলের মাটির ভাষায় প্রচুর গান রচনা করেছেন। সে গানগুলো এ অঞ্চলের মানুষের কাছে বেশ জনপ্রিয়।
প্রিয় খাবার –
নোয়াখালীর মানুষ আথিতিয়তায় অতুলনীয় । এ জেলার পিঠাগুলো সারাদেশে বিখ্যাত। চিতই পিঠা,ভাপা পিঠা, চিরকুটি পিঠা,পঁচা/জালা পিঠা, পাক্কন পিঠা, পুলি পিঠা, বাতাসি পিঠা, নকসি পিঠা বিশেষ ভাবে উল্লেখ যোগ্য। তবে এ জেলার মহিশের দধি, নারকেল নাড়, ম্যাড়া পিঠা সারাবিশ্বের জন্য বিখ্যাত।
নোয়াখালীর বিখ্যাত গুণিজনদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য-
আনিসুল হক, আব্দুল মালেক উকিল, আবদুল হাকিম, আবু বেলাল মো. শফিউল হক, ওবায়দুল কাদের, কবীর চৌধুরী, সার্জেন্ট জহুরুল হক, বিচারপতি বদরুল হায়দার, মওদুদ আহমেদ, বীরশ্রেষ্ঠ রহুল আমিন, শিরিন শারমিন চৌধুরী, মো. হাশেম প্রমুখ।
নোয়াখালীর দর্শনীয় স্থানসমুহ-
এই জেলার পর্যটন অঞ্চল ও দর্শনীয় স্থান হিসেবে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর, গান্ধী আশ্রম নোয়াখালী, নিঝুম দ্বীপ ও বজরা শাহী মসজিদ উল্লেখযোগ্য।
বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর-
মুক্তিযুদ্ধের বীর বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের জাতীয় সাত বীরশ্রেষ্ঠের একজন। সোনাইমুড়ীবাসীর গর্বের ধন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিন। তার নামে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর গত ২০ জুলাই ২০০৮ সালে স্থাপন করা হয় তার নিজ গ্রামে। নোয়াখালী জেলা সদর থেকে ২৫ কিলোমিটার উত্তর এবং সোনাইমুড়ী উপজেলার সদর থেকে ৮ কিলোমিটার পশ্চিমে দেওটি ইউনিয়নভুক্ত বর্তমান রুহুল আমিন নগর (বাগপাচরা) গ্রামে বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিনের পৈত্রিক ভূমিতে নির্মাণ করা হয় এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিনের পরিবারের সদস্যগণ কর্তৃকদানকৃত ০ দশমিক ২০ একর ভূমিতে ৬২ লক্ষ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হয় আধুনিক সুযোগ-সুবিধা সম্বলিত এ গ্রন্থাগার ও স্মৃতিজাদুঘর। এতে আছে একটি সুপরিসর এবং সুসজ্জিত পাঠকক্ষ ছাড়াও অভ্যর্থনা কক্ষ, তত্ত্ববধায়ক ও লাইব্রেরিয়ানের জন্য রয়েছে আলাদা কক্ষ।
গান্ধী আশ্রম-
গান্ধী আশ্রম নোয়াখালীর একটি দর্শনীয় ঐতিহাসিক নিদর্শন। জেলা সদর মাইজদী কোর্ট হতে প্রায় ২৫ কিলোমিটার উত্তরে সোনামুড়ী উপজেলার জয়াগ বাজার সংলগ্ন সড়কের পাশেই এর অবস্থান। ১৯৪৬ সালের ৭ নভেম্বর চৌমুহনী রেল মস্টেশনে প্রথম মহাত্মাগান্ধী নোয়াখালীর মাটিতে পদার্পন করেন। ধারাবাহিকভাবে চলল তার পরিক্রমা।
এভাবে ঘুরতে ঘুরতে ১৯৪৭ সালের ২৯ জানুয়ারি তিনি জয়াগ গ্রামে এসে পৌঁছেন। হেমন্ত কুমার ঘোষ মহাশয় তার জমিদারির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি জনকল্যাণ খাতে ব্যয়ের উদ্দেশ্যে মহাত্মা গান্ধীর নামে উৎসর্গ করেন। তৎকালীন জমিদার প্রয়াত ব্যারিস্টার হেমন্ত কুমার ঘোষের বাড়িতে উক্ত গান্ধী আশ্রম স্থাপিত হয়।
নিঝুম দ্বীপ-
বঙ্গোপসাগরের মোহনায় নোয়াখালীর সর্বদক্ষিণের উপজেলা হাতিয়ায় এ দ্বীপ। নোয়াখালীর আরও একটি দর্শনী স্থানের মধ্যে অন্যতম মেঘনা এখানে সাগরে পড়েছে। চারটি প্রধান দ্বীপ ও কয়েকটি চরের সমষ্টি নিঝুম দ্বীপ। কেওড়ার বন আছে এখানে। বনে হরিণ আছে অনেক। বন বিভাগের বিশ্রামাগার আছে দ্বীপে।
বজরা শাহী মসজিদ-
বেগমগঞ্জ উপজেলা সদর থেকে ৮ কিলোমিটার উত্তরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পাশে এ মসজিদ দিল্লির শাহি জামে মসজিদের অনুকরণে নির্মিত। লোকমুখে জানা যায়, দিল্লির সম্রাট বাহাদুর শাহ বেগমগঞ্জের বজরা অঞ্চলের জমিদারি দান করেছিলেন দুই সহোদর আমান উল্যা ও ছানা উল্যাকে। তারা একটি দিঘি খনন ও মসজিদ নির্মাণের জন্য ১০০ একর জমির বন্দোবস্ত দেন। মসজিদটি মার্বেল পাথরে তৈরি। দিঘিটি আছে মসজিদের সম্মুখভাগেই। মসজিদের প্রধান ফটকের দুই পাশে দুটি দেয়ালঘড়ি আছে।
মুছাপুর সি-বিচ-
এটি কোম্পানিগঞ্জ উপজেলার মুছাপুর গ্রামে ছোট ফেনী নদীর পাশে অবস্থিত। প্রকল্প বাস্তবায়নে বাংলাদেশ সরকার। তত্ত্বাবধায়নে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। এখানে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ আসে মুছাপুর সি-সিচ এবং মুছাপুর ফরেস্ট বাগান দেখার জন্য।
এছাড়াও দৃষ্টি নন্দন সোনাপুরে লুর্দের রাণীর গীর্জা, নোয়াখালীর উপকূলে নতুন জেগে উঠা চরে বন বিভাগের সৃজনকৃত ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, মাইজদী শহরে অবস্থিত নোয়াখালী জেলা জামে মসজিদ, নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, মাইজদী বড় দীঘি, কমলা রাণীর দীঘি ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য ।